ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬: ৪৮ টিম, ১০৪ ম্যাচের প্রিভিউ
বিশ্বকাপ ২০২৬ — ফুটবল যেভাবে চিনতেন, সেটা বদলে যাচ্ছে
ফুটবল বিশ্বকাপ নিয়ে আমাদের উপমহাদেশে উন্মাদনাটা আলাদা রকম। পাড়ার মোড়ে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের পতাকা, চায়ের কাপে মেসি-নেইমার তর্ক, রাত তিনটায় চোখ কচলাতে কচলাতে ম্যাচ দেখা — এই তো আমাদের বিশ্বকাপ। কিন্তু ২০২৬ সালে যেটা আসছে, সেটার জন্য কেউই পুরোপুরি প্রস্তুত না।
এবার ৪৮ টিম। ১০৪ ম্যাচ। তিনটা দেশ একসাথে আয়োজক। ৩৯ দিন ধরে টানা ফুটবল। শুনতে বাড়াবাড়ি লাগছে? কারণ এটা সত্যিই বাড়াবাড়ি — এবং এই বাড়াবাড়িটাই এবারের বিশ্বকাপকে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আয়োজন বানাতে চলেছে।
তিন দেশ, ষোলো শহর — ম্যাপটা একবার দেখুন
আগে একটা দেশ আয়োজন করতো, মাঝে মাঝে দুইটা। এবার? তিনটা — আমেরিকা, কানাডা আর মেক্সিকো।
আমেরিকায় এগারোটা শহর, মেক্সিকোতে তিনটা, কানাডায় দুইটা। ভ্যাঙ্কুভার থেকে মায়ামি, টরন্টো থেকে গুয়াদালাহারা — পুরো উত্তর আমেরিকা জুড়ে ছড়িয়ে আছে এই বিশ্বকাপ। ভৌগোলিক বিস্তারের দিক থেকে এমনটা আগে কখনো হয়নি।
আমেরিকার শহরগুলো: আটলান্টা, বোস্টন, ডালাস, হিউস্টন, কানসাস সিটি, লস অ্যাঞ্জেলেস, মায়ামি, নিউ ইয়র্ক/নিউ জার্সি, ফিলাডেলফিয়া, সান ফ্রান্সিসকো, সিয়াটল
মেক্সিকোর শহরগুলো: মেক্সিকো সিটি, মন্টেরেই, গুয়াদালাহারা
কানাডার শহরগুলো: টরন্টো, ভ্যাঙ্কুভার
উদ্বোধনী ম্যাচ হবে ১১ জুন, ২০২৬ — মেক্সিকো সিটির এস্তাদিও আজটেকায়। পৃথিবীর একমাত্র স্টেডিয়াম যেটা দুইবার বিশ্বকাপ ফাইনাল আয়োজন করেছে। মেক্সিকো প্রথম ম্যাচ খেলবে।
আর ফাইনাল? ১৯ জুলাই, মেটলাইফ স্টেডিয়াম, নিউ জার্সি। ম্যানহাটানের স্কাইলাইন চোখের সামনে রেখে বিশ্বকাপের ফাইনাল — ভাবতেই গায়ে কাঁটা দেয়।
স্টেডিয়ামগুলো দেখলে চোখ কপালে উঠবে
আমেরিকানরা স্টেডিয়াম বানায় অন্যরকম। ডালাসের AT&T স্টেডিয়ামে ৮০ হাজারের বেশি দর্শক ধরে। LA-র SoFi স্টেডিয়ামটা দেখতে মনে হয় মহাকাশযান মাটিতে নেমেছে। কাতারের সবচেয়ে বড় স্টেডিয়াম ছিল ৮০ হাজারের — এখানে সেটা গড় সাইজ।
পরিবেশটা কেমন হবে বুঝতে পারছেন তো?
৪৮ টিম, ১২ গ্রুপ — সিস্টেমটা কীভাবে কাজ করবে
এখানেই অনেকে গুলিয়ে ফেলেন, তাই সহজ করে বলি।
আগে ৩২ টিম থাকতো ৮ গ্রুপে। এবার ৪৮ টিম, ১২ গ্রুপে। প্রতি গ্রুপে ৪ টিম, প্রত্যেকে ৩ ম্যাচ খেলবে — এটা আগের মতোই। কিন্তু নতুন মোচড় হলো — প্রতি গ্রুপের প্রথম দুই টিম সরাসরি নকআউটে যাবে, আর সেরা ৮টা তৃতীয় স্থানের টিমও যাবে।
মানে? আপনি গ্রুপে তৃতীয় হয়েও বিশ্বকাপ জিততে পারেন। এটা শেষ ম্যাচডেতে কী ধরনের নাটক তৈরি করবে সেটা কল্পনা করুন — ২ পয়েন্ট নিয়ে বসে আছেন, গোল পার্থক্য হিসাব করছেন, পাশের গ্রুপের স্কোর রিফ্রেশ করছেন — হার্ট অ্যাটাকের উপকরণ তৈরি।
সব গ্রুপ এক নজরে
ড্র হয়েছে ৫ ডিসেম্বর, ২০২৫ — ওয়াশিংটন ডিসির কেনেডি সেন্টারে। ফলাফল:
গ্রুপ A: মেক্সিকো, দক্ষিণ কোরিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, UEFA প্লে-অফ D বিজয়ী
গ্রুপ B: কানাডা, সুইজারল্যান্ড, কাতার, UEFA প্লে-অফ A বিজয়ী
গ্রুপ C: ব্রাজিল, মরক্কো, স্কটল্যান্ড, হাইতি
গ্রুপ D: আমেরিকা, প্যারাগুয়ে, অস্ট্রেলিয়া, UEFA প্লে-অফ C বিজয়ী
গ্রুপ E: জার্মানি, ইকুয়েডর, আইভরি কোস্ট, কুরাসাও
গ্রুপ F: নেদারল্যান্ডস, জাপান, তিউনিসিয়া, UEFA প্লে-অফ B বিজয়ী
গ্রুপ G: বেলজিয়াম, ইরান, মিশর, নিউজিল্যান্ড
গ্রুপ H: স্পেন, উরুগুয়ে, সৌদি আরব, কেপ ভার্দে
গ্রুপ I: ফ্রান্স, সেনেগাল, নরওয়ে, আন্তমহাদেশীয় প্লে-অফ ২
গ্রুপ J: আর্জেন্টিনা, অস্ট্রিয়া, আলজেরিয়া, জর্ডান
গ্রুপ K: পর্তুগাল, কলম্বিয়া, উজবেকিস্তান, আন্তমহাদেশীয় প্লে-অফ ১
গ্রুপ L: ইংল্যান্ড, ক্রোয়েশিয়া, পানামা, ঘানা
ছয়টা জায়গা এখনো খালি — মার্চ ২০২৬-এর প্লে-অফে ঠিক হবে। ইতালি, তুরস্ক, ইউক্রেন, ডেনমার্ক — যে কেউ আসতে পারে। এদের কেউ ঢুকলে গ্রুপের হিসাব পুরো বদলে যাবে।
যেসব গ্রুপ নিয়ে সবাই কথা বলছে
গ্রুপ C — ব্রাজিল বনাম মরক্কো: হিসাব চুকানোর সময়
২০২২ বিশ্বকাপে মরক্কো যা করেছিল সেটা কেউ ভোলেনি। বেলজিয়াম, স্পেন, পর্তুগাল — একের পর এক দৈত্যকে হারিয়ে সেমিফাইনাল। তারা আর সিন্ডারেলা না, তারা এখন সত্যিকারের হুমকি। ব্রাজিলের বিপক্ষে এটা আগুনে ম্যাচ হবে। স্কটল্যান্ড ভাববে তাদেরও সুযোগ আছে। আর হাইতি? ১৯৭৪-এর পর প্রথম বিশ্বকাপ — শুধু মাঠে নামাটাই তাদের কাছে স্বপ্ন পূরণ।
গ্রুপ H — স্পেন আর উরুগুয়ে একই গ্রুপে? নিষ্ঠুর
স্পেন ইউরো ২০২৪ চ্যাম্পিয়ন। উরুগুয়ে দুইবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন যারা সবসময় নিজেদের আকারের চেয়ে বড় ঘুষি মারে। এই দুই দলকে একই গ্রুপে রাখাটা প্রায় অন্যায়। সৌদি আরব ২০২২-তে আর্জেন্টিনাকে হারানোর স্মৃতি নিয়ে আসবে। আর কেপ ভার্দে? প্রথমবার বিশ্বকাপে — কিন্তু তাদের হালকা ভাবার কোনো কারণ নেই।
গ্রুপ I — এমবাপে বনাম হ্যালান্ড: যুগের লড়াই
এই গ্রুপের কথা শুনলেই পালস বেড়ে যায়। ফ্রান্স বনাম নরওয়ে মানে কিলিয়ান এমবাপে বনাম আর্লিং হ্যালান্ড। গ্রহের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দুই ফরোয়ার্ড, মুখোমুখি। সেনেগাল সদ্য আফ্রিকান চ্যাম্পিয়ন হয়ে আসছে — এই গ্রুপে কে প্রথম হবে, কে বাদ পড়বে সেটা ভবিষ্যদ্বাণী করা অসম্ভব।
গ্রুপ L — ইংল্যান্ড বনাম ক্রোয়েশিয়া: পুরনো ক্ষত
ইংল্যান্ডের ভক্তরা এখনো ২০১৮-র সেমিফাইনালের দুঃস্বপ্ন দেখেন। মান্দজুকিচের অতিরিক্ত সময়ের গোল। সাউথগেটের জমে যাওয়া মুখ। আট বছর পর আবার সেই ক্রোয়েশিয়া। ক্রোয়েশিয়ার সোনালি প্রজন্ম বয়সে ভারী হচ্ছে, কিন্তু মোদ্রিচের দল কখনো সহজ শিকার না। এই গ্রুপে আবেগের ঘাটতি থাকবে না।
গ্রুপ E — কুরাসাওর রূপকথা
কুরাসাও — ক্যারিবিয়ান সাগরের একটা দ্বীপ, জনসংখ্যা দেড় লাখের কাছাকাছি — বিশ্বকাপে খেলছে। প্রথম ম্যাচ কার বিপক্ষে? জার্মানি। চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন, ৮ কোটি মানুষের দেশ। এটা ডেভিড বনাম গোলিয়াথ — পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মঞ্চে। কুরাসাও পরের রাউন্ডে যাবে? সম্ভবত না। কিন্তু তারা যে এখানে আছে — এটাই ফুটবলের সবচেয়ে সুন্দর গল্পগুলোর একটা।
প্রযুক্তি যেটা এবারের বিশ্বকাপকে আলাদা করবে
AI চালিত VAR আর 3D প্লেয়ার স্ক্যানিং
প্রতিটা খেলোয়াড়কে ডিজিটালি স্ক্যান করে তাদের শরীরের নিখুঁত 3D মডেল তৈরি করা হবে। উদ্দেশ্য? অফসাইড সিদ্ধান্ত যেন প্রায় শতভাগ নির্ভুল হয়। কাতারে যে সেমি-অটোমেটেড অফসাইড সিস্টেম ছিল, সেটার আপগ্রেডেড ভার্সন আসছে — আরো দ্রুত, আরো সঠিক। সেই ৯০ সেকেন্ড ধরে লাইন আঁকার অপেক্ষা? কমে যাচ্ছে।
রেফারির বুকে ক্যামেরা
প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে রেফারিরা বডি ক্যামেরা পরবেন। AI সফটওয়্যার দিয়ে রিয়েল-টাইমে ফুটেজ স্থিতিশীল করা হবে। মানে আপনি ঘরে বসে দেখতে পাবেন রেফারি ঠিক কী দেখছেন — ঝাঁকুনি ছাড়া।
VAR-এর নতুন ক্ষমতা
এবার VAR দ্বিতীয় হলুদ কার্ড আর কর্নার কিকের সিদ্ধান্তও রিভিউ করতে পারবে। আগে শুধু গোল, পেনাল্টি, লাল কার্ড আর ভুল পরিচয়ে হস্তক্ষেপ করতে পারতো। দ্বিতীয় হলুদ যোগ হওয়া মানে — যেসব বিতর্কিত ডাবল বুকিং ম্যাচ বদলে দেয়, সেগুলোতে এখন দ্বিতীয় সুযোগ থাকবে।
বাধ্যতামূলক হাইড্রেশন ব্রেক
প্রতিটা ম্যাচে প্রতি হাফে ৩ মিনিটের হাইড্রেশন ব্রেক হবে — তাপমাত্রা যাই হোক। মেক্সিকো সিটির উচ্চতা, মায়ামির আর্দ্রতা, ডালাসের গরম — FIFA খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা নিয়ে ঝুঁকি নিতে রাজি না।
চ্যাম্পিয়ন কে হবে? আন্দাজ যার যার
স্পেন — বুকমেকারদের প্রথম পছন্দ। ইউরো ২০২৪ জিতেছে এমন ফুটবল খেলে যেটা দেখলে মনে হয় খেলাটা নতুন করে আবিষ্কার হলো। লামিন ইয়ামাল, পেদ্রি, রদ্রি — এই দল দিনে দিনে আরো ভালো হচ্ছে।
ফ্রান্স — পরপর দুই বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলেছে। ২০১৮-তে জিতেছে, ২০২২-তে পেনাল্টিতে হেরেছে। এমবাপে তার শীর্ষে। এই দলকে বাদ দেওয়া বোকামি।
আর্জেন্টিনা — ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন। আমাদের দেশের অর্ধেক মানুষের প্রাণের দল। কিন্তু প্রশ্ন একটাই — মেসি। এটা কি তাঁর শেষ বিশ্বকাপ? তিনি কি পুরোপুরি ফিট থাকবেন? ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড়কে রিপ্লেস করা তো সোজা কথা না।
ব্রাজিল — বিশ্বকাপে ব্রাজিল মানেই বিপদ। ২০২২-তে আশানুরূপ করতে পারেনি, কিন্তু এন্দ্রিক, ভিনিসিয়াস জুনিয়র, রদ্রিগো — নতুন প্রজন্ম প্রস্তুত। আমাদের পাড়ার ব্রাজিল সমর্থকরা আবার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে।
ইংল্যান্ড — বারবার কাছে এসে হারছে। ২০১৮ সেমিফাইনাল, ২০২০ ইউরো ফাইনাল, ২০২২ কোয়ার্টার, ২০২৪ ইউরো ফাইনাল। গণিতের হিসাবে কোনো একদিন তো জিততেই হবে। ২০২৬ কি সেই দিন?
ডার্ক হর্স? কলম্বিয়া, মরক্কো, সেনেগাল — সবার কাছেই গভীরে যাওয়ার মতো স্কোয়াড আছে। আর জার্মানিকে কোনো টুর্নামেন্টে কখনো হিসাবের বাইরে রাখবেন না।
সংখ্যাগুলো একবার দেখুন
এই টুর্নামেন্টের বিশালতা বোঝাতে কিছু সংখ্যা:
- ৪৮ টিম (আগে ছিল ৩২)
- ১০৪ ম্যাচ (আগে ছিল ৬৪)
- ৩৯ দিন টানা ফুটবল (আগে ছিল ২৯)
- ১৬টি শহর, ৩টি দেশ জুড়ে
- ফাইনালে যাওয়া দলকে খেলতে হবে ৮ ম্যাচ (আগে ছিল ৭)
- যে দল চ্যাম্পিয়ন হবে, তারা ইতিহাসের যেকোনো বিশ্বচ্যাম্পিয়নের চেয়ে বেশি ম্যাচ খেলে কাপ তুলবে
ফ্যানদের জন্য এর মানে হলো সাড়ে পাঁচ সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন ফুটবল। প্রতিদিন একাধিক ম্যাচ। প্যাসিফিক থেকে ইস্টার্ন টাইমজোন — রাত জাগার প্রস্তুতি এখন থেকেই নিন।
এই বিশ্বকাপ ফুটবলের জন্য কী বদলে দেবে
৪৮ টিমে বাড়ানোটা শুধু সংখ্যার খেলা না। FIFA বলতে চাইছে — ফুটবল সবার। হাইতি, কুরাসাও, কেপ ভার্দে, জর্ডান — এই দেশগুলোর জন্য শুধু বিশ্বকাপে থাকাটাই একটা প্রজন্মের স্মৃতি। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা বড় হবে এই স্মৃতি নিয়ে যে তাদের দেশ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মঞ্চে খেলেছিল।
সমালোচকরা বলবেন বেশি টিম মানে মানের পতন। কিছু গ্রুপ ম্যাচে বিশাল ব্যবধান হবে — এটা সত্য। কিন্তু যখন কুরাসাও জার্মানির বিপক্ষে দাঁড়াবে, যখন হাইতি ব্রাজিলের মুখোমুখি হবে — সেগুলো শুধু ফুটবল ম্যাচ থাকবে না। সেগুলো হবে এমন মুহূর্ত যা একটা পুরো জাতির সাথে ফুটবলের সম্পর্ক বদলে দিতে পারে।
বিশ্বকাপ ২০২৬ হবে বিশাল, এলোমেলো, অনির্দেশ্য, মাঝে মাঝে বিশৃঙ্খল। দর্শক সংখ্যার রেকর্ড ভাঙবে। এমন কিছু মুহূর্ত তৈরি হবে যেগুলো নিয়ে আমরা দশকের পর দশক কথা বলবো।
আর সব শুরু হচ্ছে ১১ জুন, মেক্সিকো সিটিতে।
অ্যালার্ম সেট করুন। ছুটির আবেদন লিখে রাখুন। এবারেরটা অন্যরকম হতে চলেছে।
একটি মন্তব্য করুন